আফরার ডায়েরি
এমনি গহীন গ্রামে থাকি যেখানে ফী বছর সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ হয়।
গত বছর শীতে যখন এলাম, হঠাৎ একদিন মাঝরাতে শুনি মাঝারি গোলাগুলির শব্দ। তবে তা বেশিক্ষণ স্থায়ী ছিলো না। পরদিন কাকীর কাছে গোলাগুলির কারণ জানতে চাইলে জানলাম যে প্রতি বছরই বছরের বিভিন্ন সময়ে দল বেধে আর্মিরা আফরা ও আফরা সংলগ্ন পাশ্ববর্তী অন্যান্য এলাকায় প্রশিক্ষণে আসে। সপ্তাহখানেক তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে গ্রাম ছাড়ে। আগে জানতাম শুধু পাহাড়ি অঞ্চলেই আর্মিদের ট্রেনিং হয়।
আর এ গ্রামে হবেই বা না কেন! গ্রামের পাশ দিয়ে রয়েছে এক গহীন জংগল! জংগলটাতে একদিন আমি নিজে ঢুকে বেরুনোর পথ হারিয়ে ফেলে কতবার গোলকধাঁধার চক্করে পড়ে গন্তব্যে তো পৌছুতে পারলামই না, বরং যেখান থেকে ঢুকেছিলাম, সেখান থেকেই বের হইছিলাম। জংগলটির গহীনতার আরও একটা নমুনা হলো, মাঝে যখন সরকার মাদকবিরোধী সাড়াশি অভিযান শুরু করলো, তখন গ্রামের অনেক নেশাখোর নাকি আত্মরক্ষায় এই জংগলে লুকিয়েছিলো। আমাদের বাপ দাদাদের আমলে নাকি জংগলে ভূত প্রেতের অবাধ আনাগোনা ছিলো। এমনও নাকি শোনা গিয়েছে যে, জংগল থেকে জীনেরা এসে ভোররাতে জংগলের পাশ্ববর্তী এক বাড়ীর নলকূপে এসে অজু করে! গ্রামের এক নারীকে অনেক আগে নাকি এই জংগলে ভূতেরা ঠেসে মেরে ফেলেছিলো। সবই জনশ্রুতি আসলে। তবে জংগল যে নিতান্তই ছোটখাটো একটা সুন্দরবন তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। শুধু বাঘ নেই এই পার্থক্য...
সে হিসেবে এ জংগলে আর্মি প্রশিক্ষণ একেবারে অবান্তর নয়। কিছুদিন আগের বর্ষায় এক দল আর্মি এসেছিলো। আশ্বিনের চরম গরমে আবার দল বেধে হাজির হয়েছে তারা। দেখা যাবে প্রায়ই বাড়ির উঠানে তিন চার জন এসে শত্রু খুঁজছে, সাথে একটা ম্যাপ। রাত হলেই মাঝে মাঝে চলবে হালকা গোলাগুলি। সোজা রাস্তা দিয়ে কখনো যাবে না, যাবে যত কর্দমাক্ত, ভেজা, স্যাঁতসেঁতে রাস্তা দিয়ে। অন্ধকারে কোনো আলো ছাড়াই চলতে হয়। হয়তো প্রশিক্ষণের নিয়মই এটি। এইতো মাসখানেক আগে এক আর্মি আমাদের বাড়ির অত্যন্ত পিচ্ছিল উঠান সন্ধ্যার সময় পার হতে গিয়ে ধপাস করে আছাড় খায়! তারপর চারপাশ তাকিয়ে আবার সটান হয়ে দৌড়!
গ্রামে আর্মি এলে মানুষদের মাঝে এক আমেজ কাজ করে। উৎসুক চোখে তারা আর্মিদের প্রশিক্ষণ দেখতে জংগলে যায়, যদিও সেখানে প্রশিক্ষণ কালীন সময়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাই প্রায়ই আর্মিদের ঝাড়ি খাওয়ার প্রশিক্ষণটা গ্রামের মানুষের হয়ে যায়...




মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন