দাদী

 এবার ঈদে দাদাবাড়ি আর নানাবাড়ি গিয়ে ফেরার সময় অন্য রকম এক কষ্ট নিয়ে ফিরেছি। রাতে ঘুম আসছে না, হঠাৎ করে সেই কথাগুলি মনে পড়লো।

যে দাদী, নানীর পরম স্নেহে শৈশব কেটেছে, সেই দাদী, নানী এবার আমাকে কোনোভাবেই চিনতে পারলো না। অবশ্য তাঁদের কসুর নয় এটা। বার্ধক্যের জাঁতাকলে পিষ্ট মানুষ দুটো নিজের গর্ভের সন্তানদেরই ঠিকভাবে চিনতে পারছে না, আর আমি তো তাঁদের সন্তানদের সন্তান। তবে আক্ষেপটা আসলে অন্য জায়গায়।
বিশেষ করে আমার দাদীর কথাটা বলতেই হয়। শৈশব থেকে বড় হয়ে একদম কামাই রোজগারে পা দেওয়া পর্যন্ত দাদীকে প্রায় সময়েই কাছে পেয়েছি। ছোটবেলায় আব্বার চাকুরীর সুবাদে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আমরা থেকেছি, কিন্তু দূরত্ব যত দূরেই হোক না কেন, আমার দাদা আর দাদী নিয়মিত বিরতিতে ছুটে যেতেন আমাদের ঠিকানায়। দাদা,দাদী এলে আসলে যে কি ভালো লাগতো! আব্বা আম্মার কত মাইরের হাত থেকে পরিত্রাণ পেয়েছি দাদা দাদীর উছিলায়, তার আসলে ইয়ত্তা নেই।
দাদী দাদাবাড়ী থেকে আসার সময় গ্রামের বাড়ির জাম্বুরা, পেয়ারা, সফেদা, নারিকেল, দানাদার মিষ্টি আনতেন। সেই খাবারগুলোতে মনে হয় অন্য রকমের স্বাদ ছিলো। এখনো যখন কোথাও জাম্বুরা, সফেদা খাই, মনে হয় দাদী এনেছে, তাই খাচ্ছি।
দাদা দাদী বাড়িতে আসা মানে হলো আমার পড়াশুনার কঠোর সিডিউলে কিছুটা শিথিলতা পাওয়া, আব্বা আম্মার কড়া শাসন থেকে কিছুদিনের জন্য মুক্তি পাওয়া, রাতের বেলায় দাদীর কাছ থেকে হরেক কিছিমের গল্প কবিতা শোনা। তীব্র গরমের রাতে যখন বিদ্যুৎ চলে যেতো, দাদী হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতেন, আর বলতেন,
"নামটি আমার তালের পাখা,
শীতকালেতে যায় না দেখা,
গরমকালের পরম সখা।"
আস্তে আস্তে আমরাও বড় হতে লাগলাম, দাদীও বার্ধক্যে উপনীত হতে থাকলেন। দাদা মারা যাওয়ার পর, নিয়ম করে দাদী আব্বার কাছে, আর আমার বাকী চাচাদের বাসায় থাকতেন। এর ভিতর দাদী এক পর্যায়ে স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে পড়েন কিছুটা। তখন তাঁর সন্তানদের বাসায় থাকার স্থায়ীত্বটাও বেড়ে যায়।
এই সময়টাতে দাদী যখন আমাদের বাসায় থাকতেন, তখন মূলত আমি আর দাদী একই বিছানায় ঘুমাতাম। দাদী একপাশে, আমি আরেকপাশে। দাদী দেখা যেতো ঠিক মতো হাটতে চলতে পারতেন না, বাথরুমে প্রায়ই আমি ধরে নিয়ে যেতাম। দাদীর পায়ে বাতের সমস্যা ছিলো, বাতাস তার কাছে অসহ্য লাগতো, কত রাত দাদীর খাতিরে আমাকে ফ্যান বন্ধ করে ঘুমাতে হয়েছে। আবার আমি যখন ফ্যান বন্ধ করে দিতাম, তখন আমার গরম লাগবে ভেবে দাদী তাঁর শীর্ণকায় হাত দিয়ে আস্তে আস্তে হাতপাখা দিয়ে আমাকে বাতাস করতেন।
যখন জনতা ব্যাংকে চাকুরী হলো, দেড়টা বছর একটানা দাদীকে নিয়েই গ্রামে থেকেছি। গ্রামের মাটির ঘরে এক প্রান্তের খাটে দাদী, আরেক প্রান্তের খাটে আমি থাকতাম। এই সময়টায় দাদী আরো বেশি বিছানানির্ভর হয়ে পড়েন। বাইরে হেটে চলে বেড়ানোর ক্ষমতা একদমই হারিয়ে ফেলেন। বিছানায় বসেই প্রসাব করতেন, পায়খানা এলে আমি তাকে ধরে নিয়ে বসিয়ে দিতাম কমোডের উপর, আবার হয়ে গেলে উঠিয়ে এনে বিছানায় শুইয়ে দিতাম। মাঝে কয়েকদিন দাদীকে খাইয়েও দিয়েছি। দুই নলা দেওয়ার পর দাদী আর খেতে চান না, কতভাবে কায়দা করে থালার ভাত শেষ করতাম, ভাবলে হাসিও পায়, আবার দুঃখও বোধ হয় এই ভেবে যে এই মানুষটাই আমাকে ছোটবেলা ভাত খাওয়ায় দিয়েছেন, এক দানা ভাত থালায় পড়ে থাকলে আল্লাহর কাছে গিয়ে নালিশ দেয়, এই কথাগুলি জেনেছি দাদীর কাছ থেকেই।
একবারের একটা ঘটনা বলি। আব্বা তখন গোপালগঞ্জে চাকুরি করেন। একদিন বাইকে করে আব্বা আমাকে নিয়ে দাদাবাড়ী গেলেন অনেকটা হঠাৎ করেই। দাদাবাড়ী পৌঁছাতেই দাদী তো একদম হতবাক। ভরদুপুরে ছেলে আর পুতা একসঙ্গে। একদিকে খুশিতে তাঁর মাথা কাজ করছে না, আরেকদিকে কি রান্না করে খাওয়াবে এই অল্প সময়ে তাও ভেবে উঠতে পারছেন না। এরপর জলদি জলদি ডিম ভেজে দিলেন দুটো, সাথে গরম গরম ভাত। আহারে সেই ডিম ভাজার স্বাদ, কই পাবো সেই স্বাদ...
অথচ এই দাদীর পাশে গিয়ে এখন বসে বারবার নিজের নাম বলে দাদীকে চেনাতে চাইলেও দাদী অনেক চেষ্টা করেও স্মরণ করতে পারেন না তাঁর পুতেরে। দাদীর স্মৃতিশক্তিই সবসময়ই প্রখর দেখে এসেছি, অথচ সেই মানুষটা তাঁর সামনে এখন কেউ এলেই ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবছা আবছাভাবে উচ্চারণ করবেন,
"তুমি কিডা?"
তিন বেলা কোনোরকমে খাবার গিলে বেঁচে থাকাটা আসলে অনেক কষ্টের। এভাবে জীবন্মৃতের মতো বেঁচে থাকার আসলে সার্থকতাটা কোথায় যেখানে জীর্ণশীর্ণ শরীরের কুচকে যাওয়া চামড়াগুলোই এখন গাঁয়ের আসল বসন...
নানীর কথাগুলি আরেক রাতের জন্য রেখে দেই।
শুভ রাত্রি।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি