হঠাৎ ব্ল্যাকআউট
সময় ২০১৪সন। তখন ভার্সিটির ফাইনাল ইয়ারে পড়ি। দুপুরে ভার্সিটি থেকে ফিরতেছি, বাসায় এসেই দেখি বিদ্যুৎ নাই। কিছুক্ষণ পর জানলাম, সমগ্র বাংলাদেশেই বিদ্যুৎ নেই। টোটাল ব্ল্যাক আউট। কখন আসবে জনা নাই।
সময় ঠিক খেয়াল নেই কয়টা বেজেছিলো তখন, তবে একদম খা খা দুপুর, আর বেজায় গরম। তবে অতটা হতাশ হয়েছিলাম না, কারণ বিদ্যুৎ এর রেগুলার ব্ল্যাক আউট না হলেও রেগুলার লোড শেডিং হতো। যার কারণে খুব একটা আবেগ কাজ করে নাই।
বিকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হতে চললো, বিদ্যুতের কোনো খোঁজই নেই, বোঝাও যাচ্ছে না আদৌ কখন আসবে, আর আসলে কি রাতের ভিতর আসবে কিনা। নোকিয়া ১৬০০ চালাতাম, সুতরাং চার্জ থাকা নিয়েও খুব একটা টেনশন কাজ করছিলো না।
সন্ধ্যার দিকে নিচে নেমে দেখলাম, মোটামুটি সব ঘরের পুরুষ মানুষ রাস্তায়। বিদ্যুৎ নিয়ে বিভিন্নমুখী গবেষণা চলছে। চায়ের দোকান গরম করা এসব আলোচনা শুনে হতাশ হয়ে পড়ছিলাম। জলদি জলদি বাসার পথ ধরি। যেতে যেতে দেখি রাস্তার দুপাশে সব ভবন অন্ধকার। অন্য সময় জেনারেটর কিংবা আইপিএস এর স্বল্প বিদ্যুৎ সাপ্লাইও থাকে। দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ অনুপস্থিতির জন্য আজ তাও নেই। ঢাকা শহরে এক ঘুটঘুটে অন্ধকার বিরাজমান। হারিকেন কিংবা মোমবাতির ম্রিয়মাণ আলোক দেখা যাচ্ছে ভবনগুলোতে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো আজ বিশ্রাম পেয়েছে কিছুটা।
সম্ভবত ০৯টার দিকে বিল্ডিং এর পানি শেষ। বিদ্যুৎ নাই, মোটর কিভাবে চলবে? পানিরও দরকার। বিদ্যুৎ কখন আসে সেই ভরসায় বসে থাকলে নাওয়া খাওয়া সবকিছু আসমানে উঠে যাবে। অতঃপর পানির একটা বন্দোবস্ত হলো। আর তা হলো, বিল্ডিং এর নিচ তলাতে একটি আপদকালীন পানির সংরক্ষণাগার ছিলো। এবার মোটামুটি মাথা খারাপ হবার জোগাড়। কারণ আমরা ছিলাম ০৪তলাতে। মনে আছে সেই রাতে, প্রায় ০১ ঘন্টা যাবত প্রায় ১০বালতি পানি নিচ তলা থেকে চার তলাতে উঠিয়েছি।
বিদ্যুৎ নেই, আশেপাশের বিল্ডিং থেকে পড়াশুনার আওয়াজও নেই। শিশু কিশোররা আজ বেজায় খুশি। আমার যতগুলো টিউশনি ছিলো, সেদিন অফ দিয়েছিলাম সম্ভবত।
বেজায় গরম, ঘরে টেকা মুশকিল। অনেক খুঁজে টুজে একটা হাত পাখা পাওয়া গেলো, সেটা দিয়েই শরীর ঠাণ্ডা করার প্রয়াস চালালাম। অনেক সাবধানে হাত চালানো লাগছিলো, না হলে মোমবাতি নিভে যাবে আবার।
এলাকার কোনো দোকান থেকে জোরে কোনো গানের শব্দ কিংবা মাইকের আওয়াজ কিংবা আশেপাশে বাসা থেকে কোনো টিভি কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমের আওয়াজ ভেসে আসছিলো না। শতভাগ প্রাকৃতিক পরিবেশ, রাস্তা দিয়ে শুধু মানুষের কথা, রিক্সা, মোটরসাইকেল ছুটে চলার শব্দ শোনা যাচ্ছিলো। ব্যস্ত শহরে অলস নীরবতার ভাণ্ডার খুলে দিয়েছিলো সেই ব্ল্যাক আউট।
রাত ১১টার দিকে মনে হয় বিদ্যুৎ এসেছিলো। ঘরে আলো জ্বলে উঠার থেকে ফ্যানটা ঘোরার সাথে সাথে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হয়েছিলাম।
আজ প্রায় ০৮বছর পর ঠিক সেরকম একটা দিন আবারো প্রত্যক্ষ করলাম। তবে আজ সারাদেশব্যাপী নয়, কিছু এলাকাতে ব্ল্যাক আউট হয়েছে।
লিখতে লিখতে বিদ্যুৎ চলে এসেছিলো, আবার লেখার শেষ প্রান্তে এসে আবারো বিদ্যুৎ চলে গেলো। তবে এবার মনে হয় রেগুলার লোড শেডিং, ব্ল্যাক আউট নয়...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন