বিরিশিরি ভ্রমণ
গন্তব্য বিরিশিরি। সকাল সকাল শুম্ভু বাজার ব্রীজ থেকে ঢাকা থেকে আসা নেত্রকোনাগামী বাসে চড়লাম পূর্বধলা চৌরাস্তার উদ্দেশ্যে। বাসে উঠে হালকা হালকা ঘুমের পর চোখ মেলতেই দেখলাম,"স্বাগতম, সড়ক বিভাগ নেত্রকোনা!" গুগল ম্যাপে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে আশেপাশে দেখছি। কিছুক্ষণ পরে কন্ট্রাক্টরকে বললাম, পূর্বধলা চৌরাস্তা এলে নামিয়ে দিতে। কন্ট্রাক্টর আমাকে অবাক করে দিয়ে জানালো পূর্বধলা চৌরাস্তায় ছেড়ে আসছি আমরা। যাত্রার শুরুতেই হোচট!
ততক্ষণাত ভবের বাজার নেমে ময়মনসিংহগামী বাসে উঠলাম আবার চৌরাস্তার উদ্দেশ্যে। এবার খুব খেয়াল, যেন চৌরাস্তা মিস না হয়। গুগল ম্যাপে ঠিক ভরসা করতে পারছিলাম না। রাস্তার চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি রাখছি। কিন্তু সমস্যা হলো, বেশি সতর্ক থাকায় এবার যেখানে নামার তার প্রায় ২০ কদম আগে নামলাম। যাক, কি আর করার, হেটে হেটে শ্যামগঞ্জ জাংশনে পৌঁছে নাস্তাটা সেরে নিলাম।
এবার বিরিশিরির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবার পালা। উঠলাম এক সিএনজিতে, কিন্তু প্রায় ২০ মিনিট বসে আছি সিএনজি এখনো ৩জন যাত্রীর অপেক্ষায় অনবরত হাঁক ছেড়ে চলেছে, যাত্রী না পাওয়া পর্যন্ত তার ছাড়ার লক্ষ্মণ নেই। ঠিক এই মুহুর্তে আশীর্বাদ হয়ে এলো একটি বাস।
সিএনজি ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে বাসে চড়ে বসলাম, কিন্তু বাস প্রায় পুরোটাই ফাকা। এমনকি ড্রাইভারের সিটও ফাকা। দশ মিনিট হয়েছে বাসও ছাড়ে না। হতাশা কাজ করা আরম্ভ করলো৷ ভাবছি নেমে কি বাইক নিবো রিজার্ভ! ভাবতে ভাবতেই দেখলাম ড্রাইভার এসে গাড়ি চালু করলো। ফাইনালি যাত্রা শুরু...
(লিখতে লিখতে প্রায় ১০কিমি চলে এসেছি, আশা করছি ঘন্টা খানেক এর মধ্যে পৌছুবো। দুইপাশের ক্ষেতখামার, খোলা মাঠ, আর মাঝখান দিয়ে ছুটে চলা আধা ভাংগা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি বিরিশিরির পানে। বিরিশিরির শুরুটা হয়েছে বিশ্রীভাবে, আশা করছি শেষটা হবে সুশ্রী ভাবেই )
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সকালে বিরিশিরি পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দুপুর ১২টা বেজে গেলো। তবে সকালে বলেছিলাম, আধা ভাংগা রাস্তা। বিরিশিরির কাছে যতই এগিয়েছি, রাস্তা যেন ততই বন্ধুর হচ্ছে, সাথে সমানুপাতে ধুলার চাদর, কালো জ্যাকেটের রঙ সাদা হবার জোগাড়! রাস্তা কোথাও কোথাও অস্তিত্বহীন, কাদা, বালি, অর্ধেক আছে অর্ধেক নেই, মানে সে রাস্তায় বাস সোজা হয়েই চলতে পারছে না। একদম শোচনীয় রাস্তা। ভেবেছিলাম বিরিশিরি নেমে রেহাই পাবো, না ভুল! অটো নিয়ে সোমেশ্বরী নদীর এ পার পর্যন্ত পৌঁছাতে গিয়ে যা অভিজ্ঞতা হলো, তাতে মনে হলো, এই রাস্তাটুকু উড়ে এলে মন্দ হতো না।
যাক,শেষ পর্যন্ত সোমেশ্বরী নদী পার হলাম, কাঠের ব্রীজের উপর দিয়ে। নদী একেবারেই পানিশুন্য, চর জেগে উঠেছে, নদী থেকে বালি নেওয়ার জন্য বহু ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে পারে। আর সে কারণেই মূলত নদীর আগের রাস্তার এমন বেহাল দশা!
নদী পার হয়েই অটো রিজার্ভ নিয়ে নিলাম স্পটগুলো দেখার উদ্দেশ্যে। প্রথম গন্তব্য বিজয়পুর চীনা মাটির পাহাড়। নদী পার হয়েও প্রায় ৬কিমি বিজয়পুর। যাওয়ার পথে আশেপাশের লোকালয় দেখে মনে হলো, এখানে হাজংদের বসতি বেশি। প্রায়ই রাস্তায় তাদের দর্শন পাচ্ছিলাম। তবে বসতি অনেক কম। দুইপারে ধূ ধূ মাঠ, ফসলি জমি। জমির দামও খুব সস্তা, শতক প্রতি ১লাখ টাকা। বিজয়পুরের কিছু আগে "স্বামী বিবেকানন্দ অনাথ আশ্রম" এর সাইনবোর্ড দেখতে পেলাম, কিন্তু যাওয়া হয় নি।
প্রায় ১৫ মিনিটের অটোযাত্রার পর বিজয়পুর চীনামাটির পাহাড়ে এসে পৌছালাম। বিজয়পুর চীনা মাটির গোলাপি পাহাড়ের শ্বেত শুভ্র শক্ত মাটি, পাহাড়ের অদ্ভুত গোলাপি রঙ সাথে স্বচ্ছ নির্মল পানির অপরূপ এক লেক। শুধু বই পুস্তকেই আমার ধারণা সীমাবদ্ধ ছিলো, আজ অবলোকন করলাম। মোটামুটি পুরো পাহাড়টাই ঘুরে দেখলাম, যদিও হাটুর ইঞ্জুরি নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিলো, আর বহুদিন পাহাড় চড়া হয় না, তবে আল্লাহর ইচ্ছায় নির্বিঘ্নে ঘুরে দেখলাম। এখানেই প্রায় ০১ঃ৩০বেজে গেলো। দ্রুত পরবর্তী গন্তব্যের দিকে যাত্রা করলাম।
এবার এলাম চীনা মাটির পাহাড় থেকে মিনিট দশেক বাদে অবস্থিত "সাধু জোসেফ ধর্মপল্লী, রাণীখং"। অনেক পুরনো একটি গীর্জা, স্থাপন ১৯১২ সালে। গেটেই বাধা, ঢোকা যাবে না, ফাদারের নিষেধ, অনেক অনুনয় বিনয় করে ঢুকতে পারলাম। তেমন বিশাল কোনো জায়গা এটি নয়। গীর্জার মূল ভবন, যীশু খ্রীষ্টের মূর্তি, সাথে আরো কিছু স্থাপনা দেখে বের হয়ে এলাম। বের হবার পথে চোখে পড়লো পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সোমেশ্বরীর ওপারে আবছা আবছা ফুটে উঠা ধোয়ার মতো পাহাড়ের উপর তারকাটা। বুঝতে বাকি রইলো না, ঐটা বাংলাদেশ - ভারত সীমান্ত চিহ্ন।
এবারের গন্তব্য সেখানেই, " জিরো পয়েন্ট "। অটো আমাদের নিয়ে চললো বিজয়পুর বিজিবি ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। ১০ মিনিটের মতো যাওয়ার পরই পৌঁছে গেলাম। বিজিবি ক্যাম্প ঠিক সোমেশ্বরী নদীর তীরেই। এই সোমেশ্বরী নদী দিয়েই জিরো পয়েন্ট যেতে হয়। একটা গ্রুপের সাথে আমরাও নৌকায় উঠে বসলাম জিরো পয়েন্টের উদ্দেশ্যে।
শীতের মৌসুম, সোমেশ্বরী পানিখরায় ভুগছে, তবে মাঝির ভাষ্যমতে, বর্ষার সময় দুকূল ছাপিয়ে পানি উঠে। আমরা এগুতে থাকলাম। পানি কম থাকায় সোমেশ্বরীর স্বচ্ছ জলধারা দিয়ে তলদেশ দেখা যাচ্ছিলো৷ সূর্যের আলোতে সোমেশ্বরীর তলদেশের বালু, নুড়িপাথর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো, আর তাই জায়গায় জায়গায় উত্তোলন করছে কয়েক দল লোক। চরের উপর রাখা কয়লার স্তূপ দেখে জানলাম সোমেশ্বরী কয়লারও আধার। ভারতের মেঘালয় থেকে বয়ে আসা সোমেশ্বরীর এসব সম্পদই এখানকার মানুষের জীবিকার আশ্রয় হয়ে উঠেছে।
জিরো পয়েন্ট যদিও আসলাম, তবুও প্রকৃতপক্ষে জিরো পয়েন্ট আরো খানিকটা সামনে ছিলো। ফোনের দুর্বল নেটওয়ার্ক দিয়ে লোকেশন বোঝার চেষ্টা করলাম। জিপিএস আমাদের সীমানারেখার একদম উপরে অবস্থান দেখালেও জুম করে দেখলাম, আমরা সীমানারেখা থেকে আরো খানিকটা দূরে। শুধু ওপারে মেঘালয় চোখের দেখা দেখেই তুষ্ট থাকলাম।
![]() |
| জিরো পয়েন্ট |
![]() |
| জিরো পয়েন্ট যেতে |
![]() |
| সোমেশ্বরীর গর্ভের কয়লা |
![]() |
| বিজিবি ক্যাম্প |
ফেরার পালা। দেরী না করে বিজিবি ক্যাম্পে ফেরত আসলাম। তখনো একটা জায়গা বাকি, যদিও সেটা সংলগ্ন কমলাপাহাড়। দ্রুত সেখানে ছুটলাম। তবে কমলাপাহাড়ে যারপরনাই হতাশ হলাম, কমলাগাছের তো ছিটেফোঁটাও দেখলাম না, উলটো মনে হলো পাহাড়টা পরিত্যক্ত৷ একটা ওয়াচটাওয়ার ছিলো পাহাড়ের উপর, সেটারও সিড়িতে কাটাতার আটকানো, যেন কেউ উঠার কথাও না ভাবে। অযথা কষ্ট করে পাহাড় বেয়ে উঠলাম, যাক ব্যায়াম হলো ভেবে সান্ত্বনা নিলাম।
অবশেষে রওয়ানা হলাম এবার বিরিশিরির দিকে। আবারো সেই ধুলাবালি, তীব্র বন্ধুর, দুর্গম রাস্তা পেরিয়ে বিরিশিরি ফিরে বিকেলের খাবার খেয়ে বাসে উঠলাম ময়মনসিংহ এর উদ্দেশ্যে। এসে আপুর বাসায় চটজলদি দুটো খেয়ে নাকে মুখে এসে দুলাভাই, আপুকে বিদায় জানিয়ে সিলেটের গাড়ি ধরলাম। নবীগঞ্জ ফিরছি।




















মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন