বানভাসী বানিয়াচং

মাত্র একদিন আগে এই রাস্তা দিয়ে বানিয়াচং গিয়েছি। একদিনের ব্যবধানে আজ রাস্তা পানির নিচে। আর শুধু যেমন তেমন নিচে নয়, প্রায় ২ফুট পানির নিচে রাস্তা তলিয়ে গিয়েছে।

নবীগঞ্জ থেকে বানিয়াচং পর্যন্ত ১৮কিমি যে রাস্তা সেই রাস্তার অর্ধেক পড়েছে নবীগঞ্জের ভিতর, আর বাকী অর্ধেকের থেকে কিছু বেশি পড়েছে বানিয়াচং এর ভিতর। গত পরশু এই রাস্তা দিয়েই যাওয়ার সময় বন্যার আবহ বুঝতে পেরেছিলাম। সাধারণত রাস্তার পাশের দুই ফিট নিচ থেকে পানির প্রবাহ শুরু হয়। সেখানে সেদিন দেখি পানি প্রায় রাস্তা ছুঁই ছুঁই। পুরোটা রাস্তারই একই অবস্থা দেখেছি। কিন্তু আজ দেখলাম সম্পূর্ণ অন্য এক চিত্র।
পরশু গাড়ি নিয়ে যাবার সময় রাস্তার দুপাশ খুব ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে করতে গিয়েছি। পানির উচ্চতা অস্বাভাবিক থাকলেও সেটি মানুষের বসত, ভিটা, চলার রাস্তা গ্রাস করে নি তখনো। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই দেখেছিলাম।
কিন্তু আজ দেখলাম মানুষের চোখে মুখে আতঙ্ক। মানুষ তার ঘর বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় এসে ঠাই নিয়েছে। যে এলাকায় আগের দিনও দেখেছি শিশুরা খেলছে, আজ দেখলাম কলাগাছের ভেলা বানিয়ে আপাতত সেখানে পুরো পরিবার জড়সড় হয়ে আছে। একজনকে দেখলাম পানির আসার আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে ঠেলাগাড়িতে করে নিজের বাসার জিনিসপত্র বের করে আনছে। কিছু জায়গা পর পর ট্রলার, নৌকা দাঁড়িয়ে আছে।
নবীগঞ্জ উপজেলার একদম শেষপ্রান্তে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। একদিন আগেও সেটি ছিলো জনশূন্য, অথচ আজ সেই তিন তলা ভবনই আশ্রয়হীন মানুষে গিজ গিজ করছে। আশেপাশের এলাকা থেকে যে যেভাবে(কেউ কলাগাছে ভেলা, কেউ বাঁশের ভেলায় করে) পারছে, সেভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে ভীড় জমাচ্ছে। সেদিন যেসব বাড়ির উঠানকে দেখেছি পানি ছুঁই ছুঁই, আজ সেসব বাড়ির ঘরের ভিতর পানিতে প্লাবিত।
বানের পানি যে শুধু মানুষকে আক্রান্ত করেছে তা নয়, জলজ প্রাণী বিশেষ করে সাপের প্রকোপও অত্র এলাকায় বেড়েছে। সেদিন ফেরার পথে দেখি রাস্তায় কিছু মানুষ মিলে সাপ মেরে ফেলে রেখেছে, আজকেও দেখলাম, তবে ঠিক উপজেলা চত্বরে একটা বাচ্চা সাপকে মেরে ফেলে রাখা হয়েছে।

মেরে ফেলা বাচ্চা সাপ

এসব দেখতে দেখতে নবীগঞ্জ উপজেলা ছাড়িয়ে বানিয়াচং এ ঢুকেছি সবে মাত্র। বানিয়াচং ঢুকতে প্রথমেই পড়ে কাগাপাশা ইউনিয়ন। এর পাশেই রয়েছে সুবিশাল "কাগাপাশা হাওড়"। যে হাওড়কে কেন্দ্র করেই বর্ষার সিজনটাতে এখানে নৌকার ঘাট জমজমাট হয়ে উঠে।
সেদিনও দেখেছি কাগাপাশা বাজার ঠিকঠাক। কিন্তু আজ বাজার পুরোটাই পানির নিচে। আমি বাইক নিয়ে আগাতে গিয়ে দেখি বাইক প্রায় অর্ধেক তলিয়ে গিয়েছে। বানের পানি রাস্তা গ্রাস করে ফেলেছে। কচুরিপানার জট ঠেলে সামনে এগুতে থাকলাম, দেখলাম পানির স্তর কিছুটা নেমেছে।
কাগাপাশা বাজার শেষ হলেই প্রায় তিন কিমি সড়ক চলে গিয়েছে হাওড়ের ভিতর দিয়ে। এই রাস্তাও সেদিন পানি থেকে খানিক উপরে ছিলো। আজ আর নেই। বানের জল ঢুকে গিয়েছে। শুধু ঢুকেই নি, আরো পানি অত্যন্ত জোরেসোরেই ঢুকছে। এর মধ্যে দিয়ে আগাতে গিয়ে বুঝলাম, সামনের কয়েক কিমি এভাবে আগানোর দুঃসাহস করলে একটু অসাবধানতায় সোজা পাশের হাওড়ে সলিল সমাধি হবে। আগে জীবন, তারপর কাজ। অগত্যা গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা নবীগঞ্জ রওয়ানা হলাম।

পানি প্রায় হাওড় ছুঁইছুঁই
এ অঞ্চলে আপাতত বর্ষা কমেছে, কিন্তু পানি কমার লক্ষণ নজরে পড়ছে না। পানি বাড়ছেই। পানির যে স্রোত দেখলাম, তাতে নির্দ্বিধায় বলা,যায় এই পানি আরো বাড়বে, উচ্চতাও বাড়বে, তীব্রতাও বাড়বে, এলাকা থেকে এলাকাকে গিলে খাবে। কবে মানুষের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে জানা নেই...

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি