গতকাল এইচএসসি পরীক্ষার ডিউটি শেষ করে কেন্দ্র থেকে উপজেলায় ফেরার নতুন পথ খুজে বের করার টার্গেট নিয়ে গাড়ি হাকিয়ে ফেললাম। কেন্দ্রের প্রিন্সিপাল মহোদয়ের পরামর্শ মোতাবেক গাড়ি হাকিয়ে চলতে থাকলাম। গাড়ি আগাতে আগাতে প্রথম পয়েন্ট বান্দের বাজার এ বিনা প্রতিবন্ধকতায় এসে পড়লাম। প্রিন্সিপাল মহোদয় বলেছিলেন, রাস্তাই আপনারে নবীগঞ্জ নিয়া যাইবো। তাই আমিও রাস্তার ডান বাম না দেখে সোজাই এগিয়ে চললাম। কিছুদূর এগুতে একদম সোজা পাকা রাস্তা দেখে মন আমার উড়ু উড়ু, তাই বাইকের এক্সিলারেটরেও একটু জোর দিলাম। দুপাশে খোলা মাঠ, আকাশে হালকা মেঘ, রাস্তার দুধারে হাওড়, জলাশয়। আর রাস্তা একদম ফার্স্ট ক্লাস। সব মিলিয়ে বাইকারের জন্য স্বর্গ পরিবেশ। মহানন্দে গাড়ি টেনে চলতে চলতে প্রথম সম্বিত ফিরলো রাস্তার বাঁ পাশে দূরত্ব লেখার মাইলফলক দেখে। দেখলাম, সুনামগঞ্জ ৪৫ কিমি, শান্তিগঞ্জ ২৩ কিমি। দেখেই অশান্তি শুরু হয়ে গেলো। তবে বিচলিত না হয়ে এগুতে থাকলাম, ভাবলাম হয়তো ডানে বাঁয়ে কোনো রাস্তা আমাকে নবীগঞ্জ নিয়ে যাবে। যেতে থাকলাম।
এবার আরো সামনে এগিয়ে বুঝলাম," বাইক, তুমি পথ হারাইয়াছো!" কপালকুণ্ডলার মতো কপালে হাত দিয়ে দেখলাম, আমি নবীগঞ্জ ছেড়ে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় ঢুকে গিয়েছি। এবার আর সামনে এগুনোর সাহস পেলাম না। গুগল ম্যাপ তারপরও আমাকে বলছে, সামনে আগালে আরেক রাস্তা আছে। বুঝলাম খাল বিল নদী নালা সবই তো গুগল ম্যাপের রাস্তা, মাফ করো গুগল ম্যাপ, মানব ম্যাপে স্বাগতম। গাড়ি ঘুরিয়ে আবার পেছনে যাত্রা শুরু করলাম। আবারো সেই স্বর্গ পরিবেশ, পাকা রাস্তা, তবে এবার সতর্ক দৃষ্টি রেখে চললাম রাস্তার আশেপাশে। এগুতে এগুতে হঠাৎ চোখে পড়লো এক বাজারের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা চলে গিয়েছে। এক অলস বসে থাকা মুরব্বির অলসতায় ছেদ টেনে জিজ্ঞেস করলাম, চাচা, নবীগঞ্জ এদিক দিয়া যাওয়া যাইবো নি। চাচা তার সুদীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতাপূর্ণ চাহনি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন,"পথিক, তুমি ঠিকই ধরিয়াছো!"
এবার আত্মবিশ্বাসী হয়ে আবার চলতে থাকলাম। মিনিট পাঁচেক পরই ঘুরে ফিরে সেই বান্দের বাজার এসে দেখলাম, যেই রাস্তার সোজা ধরে আমি চলে গিয়েছি, ডানে আরেকটা রাস্তা চলে গিয়েছে, এবং প্রিন্সিপাল মহোদয়ের কথা আবারো মনে পড়লো, রাস্তাই আমারে নবীগঞ্জ নিয়ে যাইবো। যথারীতি ঐদিকেই গাড়ি ঘুরালাম, চলতে থাকলাম।
এবার রাস্তাটা চিনি, আগেও বার কয়েক এসেছি। কিন্তু কাল মনে হয় মাথা আমার টাল মাটাল হয়ে গিয়েছিলো, সেজন্যই তো যে রাস্তা আমাকে নবীগঞ্জ নিয়ে যাবে সেটা ফেলে আমি আবারো শর্টকাটের ধান্দায় ডান দিকে চলে যাওয়া রাস্তা ধরলাম। ও মা, এ রাস্তায় দেখি গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হয়। কি মুশকিল। যেতে থাকলাম। যেতে যেতে এশিয়ার সর্ববৃহৎ গ্যাস ফিল্ড বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডের পাশ দিয়ে যেতে থাকলাম। রেস্ট্রিকটেড এরিয়া। ভেতরে যাওয়া যাবে না৷ এখানে এসে আমার নিজেকে ২০১৪ সালে দেখা হলিউড মুভি দ্যা সিগনাল এর নায়কের মতো মনে হচ্ছিলো, যে ইউএসএ এর হাইলি সিক্যুর্ড এরিয়া Area 51 এর ভিতরে গিয়ে বের হওয়ার আর পথ খুজে না পেয়ে দিগ্বিদিক ছুটে বেড়ায়। আমি বাইরে থেকে চোখে আর ক্যামেরায় যতটুকু নেওয়া যায় ক্যাপচার করলাম। ভেতরটায় গেলে আরো ভালো লাগতো। বাইরে থেকেই বুঝতে পারছিলাম গ্যাস ফিল্ডের বিশালতা। একটা সুউচ্চ টাওয়ারের মাথায় জলন্ত অগ্নিশিখাই জানান দিচ্ছিলো এখানে গ্যাসভান্ডারের সুবৃহৎ আস্তানা। আস্তে আস্তে গাড়ি নিয়ে গ্যাস ফিল্ডের পাশ দিয়ে যেতে যেতে এক সময় গ্যাস ফিল্ড ছাড়িয়ে এলাম। এসে দেখি সামনে আর রাস্তা নেই, একটা ডানে, একটা বামে। সৌভাগ্য এই যে, ঐ মুহুর্তে আরেক ভদ্রলোক বাইক নিয়ে সেদিক দিয়েই যাচ্ছিলেন। তার কাছে শুনে আবারো বামে পথ ধরলাম।



 |
|
এবার রাস্তার অবস্থা শোচনীয়, মাঝে খাদ হয়ে গিয়েছে, বৃষ্টির পানি জমে আরো ভয়ানক অবস্থা। আল্লাহর নাম নিয়ে এসব জায়গা পার হয়েছি। যাক বিপদ হয় নি তেমন। এগুচ্ছি তো এগুচ্ছি। রাস্তা কখনো ভালো, আবার কখনো অতি দুর্বিষহ। আবার কখনোবা রাস্তার দুপাশে বিশাল পুকুর ধানক্ষেত। সবমিলিয়ে পুরোটা রাস্তা থ্রিলিং ছিলো। এভাবে যেতে যেতে এক বাজারে এসে পড়লাম, বুঝলাম আমি কুর্শি ইউনিয়নে আছি। এখানেও আগের সেই বিপাক, ডান বাম। এতোক্ষণ বাম দিকে সুযোগ দিয়েছি, এবার ডান দিককে দিবো। দেখি কি হয়। এগুতে শুরু করলাম। ৫মিনিট গাড়ী টানার পর যে রাস্তায় এসে উঠলাম, শৈশবের পণ্ডশ্রম কবিতার কথা মনে পড়ে গেলো। যে রাস্তাকে বাদ দিতে যেয়ে আজ এতো এতো এডভেঞ্চার, ঘুরে ফিরে সেই একই রাস্তায়। ধরণী, দ্বিধা হও।
আপাতত আর কোনো রাস্তা চাই নাই, উপজেলায় ফিরতে হবে। তালকানা হয়ে কত আর ঘুরবো। নিজেরও হালে পানি নাই, গাড়িরও পেটে তেল নাই, সুতরাং ভাংগা হোক আর যাই হোক, এই রাস্তাই এখন আমারে নবীগঞ্জ নিয়া যাইবো 
৪০ মিনিটের পথ আমার ১ঘন্টা ৪০ মিনিটে এসে ঠেকলো, ফলাফল ইজ ইকোয়াল টু জিরো।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন