হলো না যাওয়া কুলাউড়া

মানুষ আসলে কল্পনায় পাহাড় তৈরি করে ফেললেও হয় আসলে সেটাই যেটা উপরওয়ালা চান।

গতকাল সকালে হঠাৎ করে মাথায় ভূত চেপে বসলো কুলাউড়া যাবো। বহুদিন কোথাও যাই না, একটু বায়ু পাল্টানো দরকার। কিন্তু আকাশের মেঘাচ্ছন্নতা আমার ভ্রু জোড়াকে কুচাকাতে বাধ্য করলো। আমি গুগলে আজকে কুলাউড়া, মৌলভীবাজারের ওয়েদার আপডেটটা চেক করলাম, দেখলাম নবীগঞ্জ থেকে তুলনামূলক ভালো ওয়েদার সেখানে। আশান্বিত হয়ে দ্রুত গোসল করে মোটামুটি রেডি হয়ে সবকিছু গুছিয়ে নিলাম। তারপরও আরো সিউর হওয়ার জন্য কুলাউড়ার সহকারী প্রোগ্রামার সেলিম বাবু ভাইকে ফোন দিলাম কি অবস্থা আকাশের জানতে। ভাই জানালেন কিছুক্ষণ আগেই নাকি এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। ফোন রেখে আবারো কিছুটা চিন্তিত হলাম, এই বাদলা ওয়েদারে কি বের হওয়া উচিত হবে। বাইরে বারংবার চোখ দিচ্ছি, একবার দেখি গুড়ি গুড়ি, আবার দেখি নেই। এই চলছে। বেরুবো কি বেরুবো না এই দোটানায় অনেক ক্ষণ থেকে একটা ডিসিশনে এলাম, না বের হবো। রেইনকোটটা সাথে করে নিয়ে নিলাম, যেন পথে বৃষ্টির বাগড়া বেশি হলে পরে নিবো।
যাক সব কিছু নিয়ে গোছগাছ করে বেরিয়ে পড়লাম ০৯:৩০ নাগাদ। নিচে নেমে বাইকটা বের করে নিয়ে আগে দ্রুতই গ্যারেজ থেকে চাকায় হাওয়া ভরে নিলাম। গাড়ীতে তেলও কম আছে। ভাবলাম কিছুটা এগিয়ে গিয়ে অকটেন নিবো, সাথে আমিও নাস্তাটা সেরে নিবো। প্ল্যান অনুযায়ী নবীগঞ্জ থেকে রুদ্রগ্রাম রোড ধরে ১০কিমি রাস্তা গেলে একটা রেস্টুরেন্ট পড়ে, মনে আছে মাঝে এক রাতে সেখানে গিয়ে প্রায় ১৫টা রুটি গিলেছিলাম, সাথে হাঁসের মাংস। আবার সেখানে ফিলিং স্টেশনও আছে, মানে আমারও খাওয়া হবে, গাড়ীরও খাওয়া হবে। বিসমিল্লাহ বলে যাত্রা শুরু করলাম।
কুলাউড়া আসলে যাওয়ার ইচ্ছেটা বহুদিনেরই ছিলো। কেন জানি না কুলাউড়ার প্রতি ফ্যাসিনেশন তৈরি হয়েছে। তবে ১০ম শ্রেনীতে জহির রায়হানের কালজয়ী উপন্যাস "হাজার বছর ধরে" পড়তে গিয়ে প্রথম আমি কুলাউড়ার সাথে পরিচিত হই। বুড়ো মকবুলের পূর্বপুরুষেরা কুলাউড়ায় ঘর বেধেছিলেন। সেই থেকে ভাবতাম, কুলাউড়া কি এমন জায়গা হবে। হয়তো গ্রাম গ্রাম, ততটা উন্নত নয়, আর নামটাও কেমন গ্রামীণ আবহ ধারণ করে। নবীগঞ্জ আসার পর একদিন বাইক নিয়ে কমলগঞ্জ পর্যন্ত চলে গিয়েছিলাম। সেদিনের পর থেকে ইচ্ছেটা আরো জেকে বসে, নেক্সট মিশন "কুলাউড়া"।
এতো কিছু ভাবছি, সাথে বাইকটাও আস্তে আস্তে এগিয়ে নিচ্ছি। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির কিন্তু থামার নাম নেই। যতো সামনে আগাচ্ছি, ততো আরো বাড়ছে। আর রাস্তায় বাইকের গতিও অনেকটা সীমিত রেখে এগুচ্ছি, কারণ এই ১০কিমি রাস্তার প্রায় ৮কিমি রাস্তাই অসম্ভব রকমের ভাঙ্গা। স্পিড বাড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায়ই নেই। ভাঙ্গা মানে যেই সেই ভাঙ্গা নয়। রাস্তার নাম নিশানা মিটে গিয়েছে কিছু জায়গায়, মনে হবে হয়তো প্রাগৈতিহাসিককালের আবিস্কৃত সড়ক এটি। মেরামতের অভাবে এমন হয়ে আছে।
যা হোক, আমি এগুচ্ছি। আগাতে আগাতে বাউসা চৌধুরী বাজার ক্রস করে আরো সামনে আগালাম। এবার দেখলাম বৃষ্টির গতি তুলনামূলক বেড়েছে, ইলশেগুড়ির প্রকটতা বেড়ে এখন মোটামুটি আমার হাত ভিজে গিয়েছে পুরোদমে এটা অনুভব করাই যাচ্ছে। রেইনকোট সাথে আছে, পরার চিন্তা একবার করলাম, তবে দেখলাম আমি হাইওয়ের অনেকটাই নিকটবর্তী, সেখানে তো গাড়ি থামাবোই। যে কারণে গাড়ির গতি আর স্তিমিত করলাম না।
এবার রাস্তা কিছুটা ভালো, গাড়ির গতিও আনুপাতিকভাবে বাড়িয়ে দিলাম। আমি নারাইন্দি নামক জায়গা ছাড়িয়ে নোয়াগাঁও নামক জায়গা এসে পৌঁছালাম। রাস্তা এখানে মসৃণ। গাড়ির গতি এখন ৫০এর ঘরে। রাস্তার বাম সাইড ধরে মোটামুটি নির্বিঘ্নে আমি আগাচ্ছি। কিছুটা সামনে, এই ধরুন ২০হাত হবে আনুমানিক, একটা ছেলে হাতে কাস্তে, রাস্তা পার হচ্ছে। দেখেই আমি হর্ন দেওয়া শুরু করেছি। ছেলেটা খেয়াল করে নি। আমি হর্ণ মেরেই যাচ্ছি, ছেলেটা নির্বিকার, এদিক ওদিক তাকায় না। ওদিকে সে প্রায় আমার গাড়ি বরাবর চলে এসেছে, আমি যে গাড়ির দিক পাল্টিয়ে রাস্তার মাঝে চলে যাবো সেই উপায়ও আর নেই। আবার ভেজা রাস্তায় হার্ড ব্রেক কষে বাইক থামাতে গেলেও রাস্তায় পড়তে হবে। ছেলেটা আর আমার মাঝখানে একেবারেই আর আমার গ্যাপ নেই, ঠিক সেই মুহুর্তে ছেলেটা আমার দিক তাকিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো, তখনো আমার হর্ন বাজছে। আমি ছেলেটাকে বাঁচাতে তাঁর সামান্য সাইড দিয়ে যাওয়ার প্রয়াস চালালাম। নিস্ফল প্রয়াস। ছেলেটার বাম হাতে আমার গাড়ির ডান হ্যান্ডেল লাগলো, গাড়িও ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তায় পড়ে গেলো, আর আমি? আমি গাড়ি থেকে ছিটকে রাস্তার পাশের ঢালু ঘাসে মধ্যে উলটো হয়ে পড়ে গেলাম। এর আগে রাস্তায় আমার ডান কনুই আর ডান হাটু মারাত্মকভাবে ঘষা খেয়ে থেতলে যায়। আমি সেই উলটো অবস্থা থেকে কোনো রকমে উঠে গাড়ি ওভাবেই রেখে রাস্তার অন্য পাশের এক মাটির ডিবির উপর বসে পড়ি। দেখি আমার ডান কনুই রক্তাক্ত, ডান হাটুর অংশে প্যান্ট ছিড়ে গিয়েছে, এমনকি নিচে থাকা থ্রি কোয়ার্টারের নিচের অংশও ছিড়েছে, আর হাটুতেও থেতলে গেছে। বাইক থেকে যখন নিচে পড়ে যাই, টের পেয়েছিলাম, আমার ডান পা গাড়ির নিচে পড়ে মোচড় খেয়েছে। ভয়ে ছিলাম ভাংলো কিনা, বসে বসে হালকা পা নাড়ানোর চেষ্টা করছিলাম। প্রচন্ড ব্যথা, তবে মুভ করতে পারছি, এজন্য ভয়টা কেটে গেলো। আমি বাউশা ইউনিয়নের উদ্যোক্তা Mohammad Samad ফোন দিলাম ঐ অবস্থায়, ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলো, সামাদ তড়িৎ চলে আসে মাত্র ১০মিনিটের মধ্যে বৃষ্টি উপেক্ষা করে। এই ১০মিনিটে পাশের ক্ষেত থেকে ছুটে আসা কৃষকদের খুব নোংরা মানসিকতা প্রত্যক্ষ করলাম। যেখানে আমি নিজে মারাত্মকভাবে জখম হয়েছি, সেখানে তারা আমাকে অহেতুক দোষারোপ করা শুরু করেছে, আমি ছেলেটাকে ইচ্ছে করে এক্সিডেন্টে ফেলেছি। ছেলেটার নাকি হাত ভেঙ্গে গিয়েছে, এখন আমাকে তার চিকিৎসার খরচ দিতে হবে। আমি চুপ করে নিজের ব্যথা আর তাদের কথা হজম করছিলাম, কোনো বাক বিতন্ডাতে না গিয়ে সামাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম।
সামাদ আসার সাথে সাথে আমাকে একটি সিএনজিতে করে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে এলো, সাথে ছেলেটিকেও আনলাম। আল্লাহর রহমতে ছেলেটার হাত ভাংগে নি, শুধু মাসলে আঘাত পাওয়ায় ফুলে গিয়েছে।
সত্যি বলতে সামাদ এতো দ্রুত না আসলে আমি ঐখান থেকে কিভাবে ফিরতাম আমার জানা নেই। সামাদ সাথে আরো একজন(নামটা ভুলে গেলাম) আমাকে নিয়ে এসে চিকিৎসা করিয়ে ওষুধ কিনে দিয়ে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যায়। কৃতজ্ঞতার ভাষা আমার জানা নেই।
এই হলো আমার কুলাউড়া সফর। যেখানে ভেবেছিলাম বর্ষণস্নাত দিনে একটি স্মরণীয় সফর হতে যাচ্ছে, সেখানে স্রষ্টার পরিকল্পনায় অন্য কিছু ছিলো, দিনটা তাই অন্যভাবেই স্মরণীয় হয়ে থাকলো।
সবার কাছে সুস্থতার জন্য দুয়াপ্রার্থী...

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি