আমার নানী
নানাবাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেশ বিকেল হয়ে গেলো। গেট দিয়ে ঢুকেই দরজা পেরিয়ে বাম দিকে তাকাতেই বিছানায় হয় বসা বা শুয়ে থাকা আমি বার্ধক্যে জর্জরিত নানীর হাস্যোজ্জ্বল শুভ্র বদনের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করবো, "ও নানু, কেমন আছেন?"
সেই বিছানায় চোখ যেতেই দেখি বিছানা খালি, একদম ফাঁকা। রুমে ঢুকেই ধাক্কা খেলাম, সেই শৈশব থেকে কৈশোর, তারপর তারুণ্য পেরিয়ে যৌবনে উপনীত হলেও এই একই দৃশ্যের সাথে পরিচিত আমি জীবনে প্রথমবারের মতো নানাবাড়ী গিয়ে এই অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলাম। হ্যাঁ, নানী আগের রাতেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। ০৬ নভেম্বর, ২০২৩।
হরতাল অবরোধ উপেক্ষা করে সেই ভোরে নবীগঞ্জ থেকে খুলনার পথে রওয়ানা হয়েছিলাম আমার নানীর মৃত নূরানী মুখখানা শেষবারের মতো দেখতে, কিন্তু পৌঁছাতে বেশ দেরী হয়ে যাওয়ায় আর তা সম্ভব হয় নি। ঘন্টা দুয়েক আগেই নানীকে কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন আমার নানী।
এর দিন দুয়েক আগেই আমার নানীর অক্সিজেন লেভেল অনেক নিচে নেমে আসায় তাঁকে কৃত্রিম অক্সিজেন দিয়ে স্বাভাবিক করা হয়েছিলো, কিন্তু অক্সিজেন ট্যাংকি খুলে ফেললেই আবারো একই অবস্থা হচ্ছিলো নানীর, তাই তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর আগেও এমন কয়েকবার নেওয়া হয়েছিলো, কিন্তু এবারই তাঁর দুনিয়ার উপরের চিকিৎসাগারে শেষ যাত্রা ছিলো কে তা জানতো।
শেষবার খুলনা গিয়েও নানীকে দেখে এসেছিলাম, নানীর পছন্দের দধি কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম, নানী দধি দিয়ে ভাত খেতেন খুব মজা করে। নানীকে বাথরুম করতে বিছানা থেকে ধরে উঠিয়েও বসিয়ে দিয়েছিলাম। নানীর স্মৃতিশক্তি অনেকটাই লোপ পেয়েছিলো, আমাকে সহজে চিনতে পারতেন না, বারবার আমার নাম বলার পরও কিছুক্ষণ পর আবারো একই প্রশ্ন,"তুমি কার ছুয়াল?" স্মৃতি এতোটাই লোপ পেয়েছিলো যে, নিজের সন্তানদেরকেও তিনি ভাই সম্বোধন করে ডাকতেন একাধারে।
আমার নানী খুব সহজ সরল, এক নিপাট ভালো মানুষ ছিলেন। সারাটা জীবন পর্দার ভিতর থেকেই কাটিয়েছেন। নিজের সন্তান সন্ততি বাদে এমনকি মেয়ে জামাইদের আপনি বলে সম্বোধন করতেন, মাথার কাপড় শত কাজের মধ্যেও মাথা থেকে নামে নি। বয়সকালে সপ্তাহে সপ্তাহে মহিলাদের জামাতে শামিল হতেন। নানীবাড়ী যখনি গিয়েছি, দেখেছি জায়নামাজের উপরই আমার নানী বসে আছেন, কোনো ওয়াক্তের নামাজ তিনি নিতান্ত অসুস্থতার মধ্যেও ছাড় দেন নি। এতোটাই ধর্মভীরু, আর ভালো মানুষ ছিলেন আমার নানী। আমার নানীর কাছে ভিক্ষা চেয়ে কোনো ভিক্ষুক বাড়ি থেকে খালি হাতে কখনো গিয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না। "ও মা, কয়ডা খয়রাত দিবা?" এই আওয়াজ শুনলেই নানী এক কৌটা চাল ভিক্ষুকের ঝুলিতে পুরে দিতেন।
শৈশবে নানুবাড়ী গেলে নানীর বিছানায় কত ঘুমিয়েছি, নানীর পাশেই। আমার নানী জোয়ান বয়সে অনেক বড়সড় মহিলা ছিলেন, বয়সের ভারে তাঁর শরীর কুজো হয়ে গিয়েছিলো, বিছানার মাঝে এক পাশ হয়ে সবসময় জড়সড় হয়ে শুয়ে থাকতেন। শ্বেত শুভ্র চেহারার আমার নানীকে অনেক মিষ্টি লাগতো দেখতে। আমার নানী খুব পান খেতেন। শৈশবে প্রায়ই দেখা যেতো নানুবাড়ী গেলে নানীর কাছ থেকে পান নিয়ে শখ করে পান খেয়েছি। এমনিতেই ফর্সা মুখ, এর মধ্যে পান খেয়ে মুখ টুকটুকে লাল হয়ে থাকতো, আর ঠোঁটে লেগে থাকতো লাজুক হাসি।
আমার নানীর সরলতার এক নমুনা দেখাই। আমার নানীর গ্রামের বাড়ী ছিলো বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার সৈয়দ মহল্লা গ্রামে। আমি যখন নানুবাড়ি যেতাম, নানীকে বলতাম, "আমি সৈয়দ মহল্লা গ্রাম থেকে ঘুরে আসলাম, ঐখানে আপনার এক লোক আপনার খোঁজ জানতে চেয়েছে!" আমার নানী মনে হয় অন্তত ৩০মিনিট আমার কাছে ঘুরে ঘুরে জানতে চাইবে, কোন সে লোক, কোন সে লোক, কেন খোঁজ করছে? অথচ আমি যে স্রেফ মজা করেই বলেছি তা নানী কোনো ভাবেই মানতে চাইতেন না।
শৈশবে ঈদের সময় নানীর কাছ থেকে নানীর কাপড়ে পেঁচানো গুপ্তধনের টুকরি থেকে ২ ৫টাকার ঈদী পাওয়া যেন আমাদের পরম আরাধ্য ছিলো। নানীর বার্ধক্য়কালে এসে সেই ২ ৫টাকা আর অজস্র মায়া মমতার বিনিময় যথাযথভাবে আসলে দিতে পারি নি। আফসোস লাগে সত্যিই।
শুনেছি, আমার নানীর মৃত্যুর খবর পেয়ে নানাবাড়ীতে লোক সমাগমের ধুম পড়েছিলো। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে এসেছে আমার নানীকে শেষবারের মতো দেখতে। অজস্র মানুষের জমায়েত হয়েছিলো নানাবাড়িতে, মানুষের ভীড় সামলে পারা যাচ্ছিলো না। আফসোস আমি নিজেই দেখতে পারি নি।
আমার নানী তো কোনো রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, বা অতো নাম ডাক ওয়ালাও কেউ ছিলেন, এক সাধারণ ধর্মভীরু, পর্দানশীন বাঙ্গালি নারী ছিলেন। এরপরও এতো মানুষ তাঁকে স্মরণে রেখেছে, এতো মানুষ দূরকে দূর থেকে ছুটে এসেছে তাঁকে একটি বার দেখতে। কিছু সাধারণ মানুষ তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জানান দিয়ে যান, তাঁর সাধারণ জীবনই আর সব মানুষের কাছে তাঁকে অসাধারণ করে তুলেছে।
এই নানী তাঁর চোখের সামনে দিয়ে তাঁর সন্তানকে কবরে যেতে দেখেছেন, বছর দুয়েক আগে আমার নানাকে কবরে যেতে দেখেছেন, অবশেষে তিনিও তাঁদের প্রতিবেশি হলেন। গোয়ালখালীর গোরস্থানে আমার নোয়ামামা, নানার পাশেই শায়িত হয়েছেন আমার নানী। মরণবেলায় আমার নানীর মুখটা নূরানী আভায় ছেয়ে গিয়েছিলো, সাদা কাফনের ভিতর দিয়ে বের করে রাখা মুখটায় প্রশান্তি আর পবিত্রতার মায়াময় আভা ঠিকরে বেরুচ্ছিলো, বার্ধক্যের শত ঘাত প্রতিঘাতে অবসন্ন শরীর আজ চির নিথর, কিন্তু পরম প্রশান্তিতে মৃত্যু নামক অমোঘ সত্যকে হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন।
আমার নানীর শেষ কতগুলি বছর বার্ধক্যের ছোবলে বেশ কষ্টে কেটেছে, আর আমি জানি আমার নানী এখন পরম প্রশান্তিতে ঘুমুচ্ছেন তাঁর চিরস্থায়ী বিছানায়, যে বিছানায় রয়েছে মাটির গন্ধ, কিন্তু জান্নাতী সুঘ্রাণ।
"আসসালামুআলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর"

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন